

নিজস্ব প্রতিবেদক:
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মসলেমপুর গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক বিদ্যুতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সংশ্লিষ্টতা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল ও চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারণাসহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। তিনি ওই এলাকার মৃত শামসুল হকের ছেলে এবং স্থানীয় বাহাদুরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্য ও দলীয় ক্যাডার হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এনামুল হক বিদ্যুৎ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে নিরীহ মানুষের ওপর নিপীড়ন চালাতেন এবং পরকীয়া ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে একাধিক নারীর জীবন বিপন্ন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ আত্মসাৎ এবং অনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়েও গ্রামবাসীর মাঝে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে।
কারখানা দখল, লুটপাট ও পরিবার উচ্ছেদ:
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ‘স্পেশাল সাহেব বিড়ি’ কারখানা দখলের ঘটনায়। কারখানার মূল উদ্যোক্তা ও ভুক্তভোগী শাহিনুর বেগমের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এনামুল হক বিদ্যুৎ তার সহযোগী শানু ও মামুনসহ একদল সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে কারখানাটিতে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় বাধা দিলে শাহিনুর বেগমের ছেলে মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান এবং কর্মচারী স্বপনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করা হয়।
হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরা, কম্পিউটার ও আসবাবপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যান্ডরোল, তামাক ও বিড়ি তৈরির আধুনিক মিক্সার মেশিন লুট করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স জোরপূর্বক দখল করে নিজের নামে ট্রেড লাইসেন্স করিয়ে নেয় বিদ্যুৎ।
ভুক্তভোগী শাহিনুর বেগম জানান, তাঁর পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিদ্যুতের নির্মম রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়। শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারে তাঁর স্বামী ও স্বামীর দুই ভাই মারা যান। জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় তাঁর এক ছেলে এলাকা ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং অপর ছেলে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। স্থানীয় সূত্রে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, উক্ত বিড়ি কারখানার আড়ালে নকল সিগারেট ও জাল ব্যান্ডরোল তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হতো।
এছাড়াও বিএনপি এবং জাতীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তি ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট প্রচারের অভিযোগ রয়েছে এই ক্যাডারের বিরুদ্ধে।
আত্মগোপন ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রতারণা:
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার এড়াতে এনামুল হক বিদ্যুৎ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। কিছুদিন ভেড়ামারা শহরের থানা সংলগ্ন একটি বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে অবস্থান করার পর তিনি দেশত্যাগের পরিকল্পনা করেন।
চায়নায় যাতায়াতকারী কুষ্টিয়ার স্থানীয় আমদানিকারক মনির হোসেনের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তাকে চায়নায় স্থায়ীভাবে বসবাসের বন্দোবস্ত করে দেওয়ার অনুরোধ জানান বিদ্যুৎ। এই প্রক্রিয়ায় মনির হোসেনের ব্যাংক হিসাবে বিদ্যুৎ প্রায় ৫ লাখ টাকা জমা রাখেন এবং জামানত হিসেবে দুটি স্বাক্ষরিত চেক গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন খরচের কথা বলে বাংলাদেশেই সেই টাকার একটি অংশ ফেরত নেন তিনি।
ভুক্তভোগী মনির হোসেন জানান, বিদ্যুৎকে নিয়ে তিনি চায়নায় যান এবং সেখানে তার ওয়ার্কিং ভিসা (জেড ভিসা)-এর প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু সেখানে অবস্থানকালে অনৈতিক জীবনযাপন ও বিলাসবহুল খরচের মাধ্যমে গচ্ছিত অধিকাংশ অর্থ বিদ্যুৎ শেষ করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও ডোপ টেস্ট করাতে গেলে জানা যায়, বিদ্যুতের নামে বাংলাদেশে বিড়ি কারখানায় হামলা, মারধর ও লুটপাটের একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অপরাধের রেকর্ড থাকায় চায়নার ভিসা প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায়।
মনির হোসেনের দাবি, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর বিদ্যুৎ উল্টো জামানতের জন্য নেওয়া চেক ব্যবহার করে কুষ্টিয়া আদালতে একটি চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করেন। অথচ বিদ্যুৎ নিজে আদালতে নিয়মিত হাজির না হয়ে বিভিন্ন স্থানে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী মনির হোসেন দ্রুত তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনামুল হক বিদ্যুতের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।










