

গৌরাঙ্গ বিশ্বাস, বিশেষ প্রতিনিধি:
গ্রাম বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য, মাটির গন্ধমাখা কুটির শিল্প আর শীতল ছোঁয়ার প্রতীক টাঙ্গাইলের বিখ্যাত পাটি শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় যে শিল্প ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের আগ্রাসনে সেই ঐতিহ্য এখন ধুঁকছে অস্তিত্ব সংকটে।টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী, ঘাটাইল, মির্জাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার, বাসাইল, ভূঞাপুর, গোপালপুর, সখীপুর, ধনবাড়ী, মধুপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে একসময় ঘরে ঘরে তৈরি হতো বেতের তৈরি শীতল পাটি। বিশেষ করে কালিহাতী উপজেলার বাংড়া, সিলিমপুর, খিলদা, ধুনাইল, এলেঙ্গা, লাঙ্গলজোড়া, ঘূনি, সালেংকা, পাটিতাপাড়া, পিচুটিয়া, আউলটিয়া ও মহিষজোড়া গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো ছিল পাটি শিল্পের প্রধান কেন্দ্র।গ্রামের সকাল শুরু হতো বেত কাটার শব্দে, উঠানে বসে নারী-পুরুষ মিলেই বুনতেন বাহারি নকশার পাটি। শীতল পাটি, বুকা পাটি, ছাইলা ও আতি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন হাজারো কারিগর।গ্রামবাংলার বিয়ে-শাদি, অতিথি আপ্যায়ন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা গরম দুপুরে বিশ্রামের জন্য পাটির ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। তখনকার দিনে একটি সুন্দর পাটি ছিল গ্রামীণ সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল প্রায় দুই লক্ষাধিক শ্রমিক ও কারিগর। বিস্তীর্ণ জমিতে চাষ হতো বেত। সেই বেত প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি পাটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় বাজারে টাঙ্গাইলের পাটির ছিল ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে ঐতিহ্যবাহী এ পণ্যের কদর। বর্তমানে প্লাস্টিক ও সিনথেটিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পাটি শিল্প। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য পরিবার আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেউ পেশা বদল করেছেন, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্য জেলায় কিংবা প্রতিবেশী দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।উপজেলা পাটি শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক হরে কৃষ্ণ পাল বলেন, একসময় এই শিল্প ছিল আমাদের গ্রামের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। এখন বাজার নেই, কাঁচামালের দাম বেশি। সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এ শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সিলিমপুর গ্রামের কারিগর কালা চাঁদ বাবু বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা এটি। সারাজীবন পাটি তৈরি করেছি। এখন বাজার না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। পিচুটিয়া গ্রামের কারিগর সুশান্ত চন্দ্র ধর বলেন, “এই কাজ ছাড়া অন্য কিছু জানি না। সরকার যদি প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজার ব্যবস্থার সহযোগিতা দেয়, তাহলে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের কার্যকর উদ্যোগ। পাশাপাশি পাটি শিল্পকে ঘিরে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও আসতে পারে নতুন গতি।গ্রামের মাটির ঘ্রাণ, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা টাঙ্গাইলের পাটি শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে একসময় হয়তো এ শিল্প শুধু ইতিহাসের পাতায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।










