

একরাম হোসেনক্যাম্পাস প্রতিনিধি:
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা উপেক্ষা করে রাজধানীর শান্তিনগরে অবস্থিত বেসরকারি হাবিবুল্লাহ্ বাহার কলেজে চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কলেজের বাইরের একজন ব্যক্তিকে দুই বছরের জন্য অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মাসিক আড়াই লাখ টাকা বেতন নির্ধারণের ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করে। জানা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন অনুযায়ী কোনো কলেজে অধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে প্রথমে উপাধ্যক্ষ অথবা জ্যেষ্ঠতম শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিতে হয়। একই সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব বিধান অনুসরণ না করেই গত বছরের ১৫ মে কলেজের গভর্নিং বডির সভায় কর্নেল (অব.) ইমরুল কায়েসকে চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২০ মে তাকে আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। নিয়োগপত্র অনুযায়ী, তাকে মাসিক ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতন ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি অনুদান ও ভাতা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বেসরকারি কলেজে এ ধরনের বেতন কাঠামো অস্বাভাবিক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া এমন নিয়োগ সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কর্নেল (অব.) ইমরুল কায়েস এর আগে কখনও হাবিবুল্লাহ্ বাহার কলেজে শিক্ষকতা করেননি। যদিও সেনাবাহিনী পরিচালিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় বাইরের কাউকে এভাবে চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ নিয়োগের সুযোগ নেই। বিশেষ প্রয়োজনে এমন নিয়োগ দিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক, যা এ ক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে কলেজের এক শিক্ষার্থী গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দেন। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশনের ৫(ক), ৫(গ) ও ৫(ঙ) ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই নিয়োগ বাতিল করে বিধি অনুযায়ী একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটির জ্যেষ্ঠতম ১০ শিক্ষকের মধ্য থেকে তিনজনের তালিকাও চেয়ে পাঠায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, কলেজ কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে গত মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবারও চিঠি দিয়ে বিধি অনুযায়ী নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের নির্দেশ দেয় এবং তা না হলে কলেজটির অধিভুক্তি বাতিল কেন করা হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়। এদিকে, কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাকে অপসারণের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় কলেজের সামনে মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজ পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ উপেক্ষা করা হচ্ছে।বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশন অনুযায়ী, অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচনি কমিটির সুপারিশ, গভর্নিং বডির অনুমোদন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু হাবিবুল্লাহ্ বাহার কলেজে এসব বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা উপেক্ষা করে এমন নিয়োগ দেশের বেসরকারি কলেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।










