

নাজমুল হাসান বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার শজিমেক হাসপাতাল: বিনামূল্যের ধোঁকায় রোগী
ট্রলি নেওয়ার টাকা নেই, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক ব্যক্তিকে এভাবে কাপড়ে জড়িয়ে হাসপাতালে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিচ্ছেন স্বজনরা। দুপুরে বগুড়ার শজিমেক হাসপাতালে নববাণীর প্রতিবেদক টিকিটে সিল দিছেন ১৫ টাকা, ট্রলি ফি লেখা ৩০ টাকা। তাহলে দুইটা মিলে ৭৫ টাকা চাচ্ছেন কেন?’– বগুড়ার সোনাতলার রফিকুল ইসলামের এমন প্রশ্নে কাউন্টারের কর্মচারী ভারী গলায় বললেন, এটাই নিয়ম। কথা কম বলেন, টাকা দেন। সকালে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এভাবেই শুরু হয় মেয়ের জন্য রফিকুলের চিকিৎসার লড়াই। মেয়ে সুমি আক্তার তখনও স্যালাইন হাতে ফ্লোরে বসা, পাশে নেই ট্রলি কিংবা হুইলচেয়ার। কিছুক্ষণ পর ছুটে আসেন এক ট্রলিবয়। তাঁর কমলা রঙের হাতাকাটা জ্যাকেটের পেছনে লেখা ‘ফ্রি সার্ভিস, শজিমেক হাসপাতাল। স্লিপ দেখিয়ে ট্রলিবয়ের কাছে রফিকুলের অনুরোধ– ভাই, অসুস্থ মেয়েটাকে একটু ট্রলিতে তোলেন।’ ওই ট্রলিবয় বললেন, ‘১০০ টাকা লাগবি। উপরে ওয়ার্ডে তুল্লা দিমু, ট্যাকা নিয়া পরে পল্টি দিয়েন না। তাদের কথোপকথন চলছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যের সামনেই। চলার পথে ট্রলি থামিয়ে তিনি বললেন, ৩০ হাজার ট্যাকা ঘুষ দিয়ে ট্রলিবয় হচি, মাসে দেয় ৫ হাজার। অনেক কষ্ট। ৫০ ট্যাকা বাড়াইয়ে দিয়েন। এখন দুধ চার দামও ২০ ট্যাকা। ওয়ার্ডে ঢোকার পর শুরু নতুন খেলা। ওয়ার্ডবয় পাশে ডেকে রফিকুলকে চুপি চুপি বললেন, কোনো বিছনা খালি নাই। মাটিতে শুতে হবে। তবে ১০০ দিলে ব্যবস্থা করতে পারি। কথামতো বিছানা মিলেও গেল চকচকে একটা নোট হাতে পেয়ে। তবে বালিশ আর চাদরের জন্য আরও নিল ৫০ টাকা।
সরকারি এই হাসপাতালে সব ধরনের সেবা বিনা খরচায় পাওয়ার কথা থাকলেও ঘাটে ঘাটে এভাবেই গুনতে হয় টাকা। খরচা করলেই মেলে সেবা। রোগীর স্বজন সেজে সপ্তাহজুড়ে এই হাসপাতালে অবস্থান নিয়ে সমকাল প্রতিবেদক দেখেছেন– ট্রলিবয়, ওয়ার্ডবয় ও দালালের উৎপীড়নে রোগীর ত্রিশঙ্কু দশা। প্রত্যাশিত সেবা চাইলে কর্তব্যরত নার্সের দুর্ব্যবহারের বিষয়টিও সবার জানা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধার কয়েক হাজার রোগী এখানে সেবা নিতে আসেন। ১ হাজার ২০০ শয্যার বিপরীতে এখানে প্রতিদিন ২ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। এখানে চিকিৎসকসহ ১৮২ পদ ফাঁকা। সীমিত লোকবল দিয়ে রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। কর্তৃপক্ষ বলছে, জনবল ঘাটতি না মিটিয়েই শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। রোগীর স্বজন জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওয়ার্ড কিংবা কেবিনে আনা-নেওয়ার জন্য যতবার তারা হুইলচেয়ার ও ট্রলি ব্যবহার করেন, ততবারই হাসপাতালের কর্মচারীকে অন্তত ১০০ টাকা বকশিশ দিতে হয়েছে। চলে দালালের ভয়ানক প্রতারণাও। রোগীর স্বজনকে নির্দিষ্ট ওষুধের দোকান ও ক্লিনিকে নিয়ে যেতে দালালরা হাসপাতালে ঢুকে তৎপর থাকে। হাসপাতালের ভেতরেই রয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। সেখানে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও দালালের তৎপরতা বন্ধে তারা উদাসীন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের সামনেই দালালরা হাসপাতাল থেকে রোগীকে অন্য ক্লিনিকে নিয়ে গেলেও পুলিশ থাকে নির্বিকার। জানতে চাইলে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হারুন-অর-রশিদ বলেন, নতুন এসেছি। বুঝতে পারি, এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। আমার সহকর্মীরা তাদের ব্যাপারে উদাসীন। পরিস্থিতি ঠিক করার চেষ্টা করছি। ভুক্তভোগীরা অসহায়
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বগুড়ার শিবগঞ্জের চণ্ডীহারা গ্রামের রবিউল বলেন, মাথায় আঘাত পেয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি আছি। ডাক্তার ঠিকমতো দেখেন না। নার্স ও স্টাফের আচরণ খারাপ। কাউকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করে ঠিকমতো উত্তর পাওয়া যায় না।’
দুপচাঁচিয়া থেকে আসা রোগীর স্বজন আব্দুল কাদের বলেন, আমার শ্বশুরকে এক সপ্তাহ আগে হাসপাতালে ভর্তি করি। ট্রলি বা হুইলচেয়ারের জন্য ওয়ার্ডবয়রা টাকা দাবি করেন। প্রতিবার রোগীর ড্রেসিং করানোর জন্য ওয়ার্ডবয়রা নেয় ২০০ টাকা করে। নন্দীগ্রামের রণবাঘার আমিনুল বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ভাইকে অপারেশন করাইছি। ট্রলি থেকে অপারেশন থিয়েটার– কোথাও টাকা ছাড়া সেবা পাইনি। ফ্রি ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও অপারেশন করার আগে আমাকে ৫ হাজার ৩৫০ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। যার কোনো হিসাব নার্সরা দেননি। সেলাই করার সুতা কিনেছি ৬ প্যাকেট। অথচ যে সেলাই দিয়েছে, তাতে ২ প্যাকেটের বেশি লাগার কথা নয়। ওটির সামনে কিছুক্ষণ
অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) দরজায় সাদা অ্যাপ্রোন পরা এক নার্স ইশারায় ডেকে নিলেন রোগীর স্বজন মজিদকে। জানালেন, অপারেশনের আগে কিছু ইনজেকশন, গজ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী লাগবে। বাইরে থেকে এনে দিন, স্টকে নেই। সঙ্গে দিয়ে দিলেন একটি প্রেসক্রিপশন। কাগজে কোনো সিল নেই, রেফারেন্স নেই, শুধু হাতের লেখায় ইনজেকশনের নাম। স্বজন ছুটে গেলেন হাসপাতালের পাশের মিম ফার্মেসিতে। দোকানদার একবার কাগজের দিকে তাকিয়ে বললেন, এইটা ওটি থেকে আসছে। তাহলে আপনার লাগবে এইটা এইটা, যার মোট দাম ৫ হাজার ৭২০ টাকা।’ মজিদ থমকে গেলেন– সরকারি হাসপাতালে এত খরচ! দোকানি বললেন, ভাই, এইগুলা সব ওটিতে ঢোকার আগে দিতেই হয়। সিস্টেম এমনই। ওষুধ কেনার পর কোনো বিল-ভাউচার দেওয়া হলো না। সরকারি হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, জরুরি ওষুধ সরবরাহ করার কথা হাসপাতাল থেকেই। তবে বাস্তবতা উল্টো। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রেসক্রিপশন। নার্স বা আয়া রোগীর স্বজনকে বলেন, এইটা তো আমাদের কাছে নেই। বাইরে গিয়ে আনেন। ওই ওষুধের দোকানে গেলে পাবেন হাসপাতালে চক্রের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নার্স ও আয়ারা রোগীর ওষুধ বাইরে বিক্রির মূল হোতা। কিছু দোকানের সঙ্গে তাদের চুক্তি আছে। হাসপাতালের বাইরে মিম ফার্মেসি, দিগন্ত ফার্মেসি ও দিগন্ত ডায়াগনস্টিক এই চক্রে জড়িত। জানতে চাইলে এই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক আবু আহম্মেদ ফয়সাল বলেন, আমরা রোগী আনি না। আমাদের কাছে এলে আমরা ওষুধ বা চিকিৎসা দিই। টাকা ছাড়া নামে না লাশ হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন মৃত ব্যক্তির বড় ভাই মনসুর আল।










