

বিশ্লেষক কলাম: সাংবাদিক সোহেলঃ
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা আমাদের প্রতিটি অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের হৃদয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি—সবকিছুতেই উৎকর্ষের দাবি উঠছে। কিন্তু এই উৎকর্ষ কি কেবল রাজপথের আন্দোলনে অর্জিত হয়? নাকি তা অর্জন করতে হয় নিবিষ্ট পাঠ, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে?
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং তার জেরে যে পদত্যাগের দাবি উঠেছে, তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো দেশের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং দক্ষ ও সুশিক্ষিত মানবসম্পদে। বিগত দিনে সৃজনশীল পদ্ধতির অপপ্রয়োগ বা বিশেষ পরিস্থিতিতে নেওয়া অটোপাসের মতো সিদ্ধান্তগুলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানকে যে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল, তা আজ আর গোপন নয়। আমরা দেখেছি, সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশের পর উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমতাবস্থায়, অটোপাসের মতো অযৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার মানকে আরও ধসিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। একজন অভিভাবক হিসেবে আমার হৃদয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতি অপরিসীম দরদ রয়েছে। তোমরা জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে, কেন তোমরা পাঠ্যবই ছেড়ে রাজপথে? আমাদের পরিবারে যখন কোনো সংকট তৈরি হয়, আমরা কি তখন বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নামি? নাকি বাবা-মায়ের সাথে বসে আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ খুঁজি? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো আমাদের দ্বিতীয় পরিবার, আর শিক্ষকরা হলেন অভিভাবক। শিক্ষাঙ্গনের সমস্যাগুলো রাজপথে সমাধান না করে কেন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে, এমনকি আমাদের শিক্ষকের কাছে বা আলোচনার টেবিলে পেশ করছ না? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনার সুযোগ যখন অবারিত, তখন কেন মাঠে নেমে মূল্যবান সময় নষ্ট করা? পড়ার টেবিলে যে সময়টুকু কাটানোর কথা, তা রাস্তায় অপচয় করা মানেই দেশের মেধা ও শ্রমের অপচয়। মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের ওপর ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু তার সমাধান পদত্যাগের হুজুগে নেই। বরং যে সকল দায়িত্বশীল শিক্ষক বা কর্মকর্তা ভুল প্রশ্নপত্র তৈরি করে বা প্রশাসনিক গাফিলতির মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এটিই হওয়া উচিত আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। শিক্ষার্থী বন্ধুদের প্রতি আমার আকুল আবেদন—আপনারা যে শক্তি ও সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন, তা যদি আপনারা সৃজনশীল গবেষণায়, প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এবং জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করেন, তবেই বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। রাস্তায় নেমে নয়, বরং জ্ঞান ও যুক্তির হাতিয়ার দিয়ে আপনারা পরিবর্তনের ডাক দিন। মনে রাখবেন, একটি ধ্বংসাত্মক আন্দোলন একটি প্রজন্মকে পিছিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একটি গঠনমূলক উদ্যোগ পুরো জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার এখনই সময়। শিক্ষা ও মেধার সাথে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। আসুন, আমরা রাজপথের উত্তাপ কমিয়ে পড়ার টেবিলের সৃজনশীলতায় ফিরে আসি। শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা সন্তানদের মতো তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিন এবং আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখুন। আগামীর বাংলাদেশ আপনাদের হাত ধরেই সমৃদ্ধ হোক, এটাই আমাদের কাম্য।










