শোক নিউজ

স্মৃতিতে সাঈদী: তিন বছর পরও আলোচনায় তাঁর জীবন ও কর্ম।

ডেক্স রিপোর্টঃ
আজ ১৪ আগস্ট ২০২৬। প্রখ্যাত ইসলামী বক্তা, লেখক ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওয়াজ, তাফসির ও ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে পরিচিতি পান সাঈদী। কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, নৈতিক জীবনযাপন এবং ইসলামী মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর বক্তব্য বিপুলসংখ্যক শ্রোতাকে আকৃষ্ট করেছিল।তাঁর বক্তৃতার অডিও-ভিডিও ও বিভিন্ন প্রকাশনা এখনও অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত। জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্ম ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিরোজপুর জেলার তৎকালীন ইন্দুরকানী এলাকার সাঈদখালী গ্রামে। তাঁর পিতা ইউসুফ সাঈদী ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি।তাঁর শৈশবের ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা হয় পিতার প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় মাদ্রাসায়। তাঁর পারিবারিক জীবনে স্ত্রী সালেহা সাঈদী এবং চার ছেলে—রফীক, শামীম, মাসুদ ও নাসিম—ছিলেন।শিক্ষাজীবন প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসা ও খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। বিভিন্ন জীবনীসূত্রে তাঁর মাদ্রাসা শিক্ষাজীবন এবং ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে কামিল পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণায় যুক্ত হন।ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিতি শিক্ষাজীবন শেষে সাঈদী দেশজুড়ে বিভিন্ন ওয়াজ ও তাফসির মাহফিলে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তাঁর সাবলীল উপস্থাপন, কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় ধর্মীয় বিষয় তুলে ধরার কারণে তিনি দ্রুত ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে বহু মানুষ ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিক জীবনযাপনের বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন বলে তাঁর অনুসারীরা মনে করেন।লেখক ও গবেষক হিসেবে ভূমিকা সাঈদী ধর্মীয় বক্তৃতার পাশাপাশি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর নামে প্রকাশিত বিভিন্ন জীবনীসূত্রে ৭০টির বেশি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোরআনের তাফসির, সিরাত, ইসলামী সমাজব্যবস্থা ও বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে তাঁর লেখা ও সংকলন পাঠকদের মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। রাজনীতি ও সংসদীয় জীবন।১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে দলটির বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে ২০০৯ সালে নায়েবে আমির হন। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ধর্মীয় বক্তা হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচিত ও বিতর্কিত ছিল। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও রায় ২০১০ সালে গ্রেপ্তারের পর সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কয়েকটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে আপিলের পর ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত রায়েও সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ও সাজা পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকেরা বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি ও প্রশ্ন তুলেছিলেন। অন্যদিকে আদালতের রায়ে তাঁকে কয়েকটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরাধিকার নিয়ে এখনও বাংলাদেশে মতভেদ রয়েছে। কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যু ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে কাশিমপুর কারাগার থেকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ আগস্ট রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগকে আলাদা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যসহ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন; সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু ও মানুষের কর্ম ইসলামে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।— সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫ আর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে—এসবের সওয়াব অব্যাহত থাকে। — সহিহ মুসলিম তাই কোনো আলেম, নেতা বা সাধারণ মানুষের মৃত্যুকে স্মরণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—তাঁর জীবনের ভালো কাজ থেকে শিক্ষা নেওয়া, ভুল থেকে সতর্ক হওয়া এবং নিজের আমল সংশোধন করা। একই সঙ্গে ইসলাম ন্যায়, সত্য ও আমানতদারির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। স্মৃতিতে সাঈদী তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দোয়া ও স্মরণ কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করছেন। ধর্মীয় বক্তা, লেখক, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। তাঁর মৃত্যুর তিন বছর পরও তাঁর বক্তব্য, বই ও রাজনৈতিক-ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।তাঁর অনুসারীদের কাছে তিনি একজন প্রভাবশালী ইসলামী বক্তা; আবার তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ও ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও বিতর্কিত একটি ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকার, মৃত্যুর কথা স্মরণ করে নিজেদের আমল সংশোধন করার এবং অন্যের ব্যাপারে ন্যায়সংগত আচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এই বিভাগের আরও খবর

Back to top button