

হাসিনুজ্জামান মিন্টু ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ
বাবা আর কখনো ডাকবেন না। রাজনৈতিক জীবনের পথপ্রদর্শক, পরিবারের আশ্রয়স্থল মানুষটি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। সেই বাবার শেষ বিদায়ে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্ত হয়ে এসে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম সুজন। হাজারো মানুষের সামনে বাবার মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অঝোরে কাঁদলেন। তার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে জানাজার মাঠের পরিবেশ, অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেক মানুষও। শনিবার (৩০ মে) দুপুরে দিনাজপুর কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ী গ্রামে নিজ বাড়িতে পৌঁছান সুজন। বাবার মরদেহের কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর নিজেকে আর সামলাতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।পরিবারের সদস্যরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাবাকে হারানোর বেদনা যেন কোনোভাবেই থামছিল না। উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসীর অনেকেই তখন চোখের পানি লুকাতে পারেননি। পারিবারিক সূত্র জানায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ রাজনীতিক ও ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাতবারের সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ দবিরুল ইসলামের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য বিশেষ বিবেচনায় তাকে কয়েক ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হয়। জানাজা ও দাফন শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাকে আবার কারাগারে ফিরে যেতে হবে। বিকেল ৩টায় শহীদ আকবর আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। শেষ বিদায়ে রাজনৈতিক সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষের ঢল নামে।জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সুজন তার বাবার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা স্মরণ করেন। তিনি উপস্থিত সবার কাছে তার বাবার জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কথা বলতে গিয়ে বারবার তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দবিরুল ইসলাম শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।১৯৪৮ সালে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দবিরুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় সরকারে তিনবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মোট সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরল রাজনৈতিক রেকর্ড গড়েন। জীবনের শেষ অধ্যায়ে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শনিবারের জানাজা যেন শুধু একজন রাজনীতিকের বিদায় ছিল না; এটি ছিল একজন পিতার প্রতি সন্তানের শেষ ভালোবাসা, শেষ শ্রদ্ধা আর শেষ অশ্রুর সাক্ষী হয়ে থাকা এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সন্তানের সেই নীরব কান্না উপস্থিত মানুষের হৃদয়েও নাড়া দিয়ে গেছে।










