গণমাধ্যম

কলম, বিবেক এবং কান্নার অধিকার: একজন সংবাদকর্মীর শেষ আকুতি ও আইনি সুরক্ষার অপরিহার্য দাবি।

মোঃ সোহেল হোসেনঃ
​সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা বা জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি এক পবিত্র আমানত, যা একজন মানুষকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে শিখায়। কলামিস্ট ও সাংবাদিক হিসেবে যখন আমি আমাদের চারপাশের দিকে তাকাই, তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। কলম যার অস্ত্র, বিবেক যার শক্তি, সেই সংবাদকর্মী আজ সমাজে সবচেয়ে বড় অসহায়ত্বের শিকার। ১. পেশার মর্যাদা এবং জীবনের নিরুপায় বাস্তবতা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যারা নিজের জীবনকে বাজি রেখে সমাজের অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়ে যান, শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে কী জোটে? একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ তো দূরের কথা, অনেক সময় তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কাল হয়ে দাঁড়ায়।
​যখন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহকর্মীরা বুকে ব্যানার ঝুলিয়ে বিচারের দাবি জানান, তখন চোখের কোণে জমে থাকা জল লুকিয়ে রাখা যায় না। একজন সাংবাদিক যখন লাঞ্ছিত হন, তখন কেবল একজন ব্যক্তি লাঞ্ছিত হন না—লাঞ্ছিত হয় রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রশ্ন জাগে, এই চোখের জল কি কেবলই ভবিতব্য? কেন রাষ্ট্রের কর্ণধার ও নীতিনির্ধারকরা এই কান্নার শব্দ শুনতে পান না? ২. রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আমাদের আকুতি রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাত-দিন পরিশ্রম করছে—এটি অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা এই রাষ্ট্রেরই অনিয়ম ও অপরাধগুলোকে জাতির সামনে উন্মোচন করে প্রশাসনকে সতর্ক করেন, সেই সাংবাদিকরাই কেন আজ সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত?
​আমরা রাষ্ট্রের কাছে কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, আমরা অত্যন্ত বিনীতভাবে কেবল চাই আইনি সুরক্ষা এবং পেশাগত নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমাদের হাতজোড় করে নিবেদন—সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একজন সহযোগী ও সহযোদ্ধা হিসেবে দেখুন। রাষ্ট্র যদি তার কলমযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সত্যের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। ৩. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মানবিক বিবেচনার আলোয় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার সর্বজনীন মানদণ্ড অনুযায়ী, সংবাদকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি সভ্য রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক যখন অপশক্তির রোষানলে পড়ে ঘরছাড়া হন, কিংবা পরিবার নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটান, তখন মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র লঙ্ঘিত হয়। আমাদের লেখা প্রতিটি লাইনের পেছনে থাকে তিল তিল করে জমানো কষ্ট, সত্য প্রকাশের অদম্য সাহস এবং একটি সুন্দর সমাজ গঠনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নকে হত্যা করা মানে পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। ৪. একজন কলামিস্ট ও সাংবাদিকের হৃদয়ের আর্তনাদ ও আইনি সুরক্ষার প্রশ্ন আজ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা বা দূর থেকে লেখা কোনো বক্তব্য নয়; এটি আমার একান্ত হৃদয় নিংড়ানো আকুতি। আমি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক মোঃ সোহেল—এই সমাজেরই একজন ক্ষুদ্র প্রতিনিধি হিসেবে এবং দেশের সকল পেশাদার সংবাদকর্মী সমাজের পক্ষে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের দুয়ারে কড়া নাড়ছি। কলম ধরে রাখার হাত আজ থরথর করে কাঁপছে, আর চোখের জল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।আমাদের অপরাধ কী? সত্য বলা কি তবে আজ সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল? জনস্বার্থে, সত্য ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পর যদি কোনো কুচক্রীমহল হয়রানি বা মানহানির ভিত্তিহীন হুমকি দেয়, তবে তা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও আইনি সুরক্ষার পরিপন্থী। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে আমার বিনীত আবেদন—আমাদের এই আর্তনাদ শুনুন, আমাদের পেশাগত অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে আমাদের কাজের পরিবেশ নিরাপদ করুন।​শেষ কথা
​আজ আর কোনো ক্ষোভ বা অভিমান নয়, চোখের জল মুছে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমাদের সকলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত বিনীত আকুতি—আমাদের বাঁচতে দিন, আমাদের কলমকে থামিয়ে দেবেন না। আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সাংবাদিকদের জীবন, মান ও কাজের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। এই মার্জিত ভাষা ও বেদনাবিধুর হৃদয়ের আকুতি যেন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলের একমাত্র প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

Back to top button