কারি শিল্প বাঁচাতে বিসিএর পার্লামেন্টে বৈঠক: সংকট মোকাবেলায় এমপিদের কাছে পাঁচ দফা দাবি।


শহিদুল ইসলাম, প্রতিবেদক:
ওয়েস্টমিনস্টার, লন্ডন, ২৪ জুন ২০২৬, ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক ও দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত গ্রেট ব্রিটিশ কারি শিল্প বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। বুধবার, ২৪ জুন এই শিল্পের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় জরুরি সরকারি পদক্ষেপের দাবিতে ওয়েস্টমিনস্টারের পোর্টকুলিস হাউসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন ইউকে (বিসিএ)। বিসিএর প্রেসিডেন্ট অলি খান এমবিই, জেনারেল সেক্রেটারি মিঠু চৌধুরী ও চিফ ট্রেজারার টিপু রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ব্রিটিশ সংসদ সদস্য কেভিন বোনাভিয়া এমপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। সভায় ব্রিটেনের রেষ্টুরেন্ট, টেকওয়ে ও হসপিটালিটি খাত বিশেষত দেশটির বিখ্যাত কারি শিল্পের বিদ্যমান সংকট, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন এবং নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় উপস্থিত কারি শিল্প প্রতিনিধিরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ভ্যাট বৃদ্ধি, কর্মীদের মজুরি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতি, ব্যবসায়িক হারের চাপ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের হাজারো স্বাধীন রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা টিকে থাকার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যবসাগুলো ক্রমেই আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। ব্রিটেনের কারি শিল্পের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিনিধিরা ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয়, কর্মী সংকট, ব্যবসায়িক টেকসই উন্নয়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্রিটেনের অন্যতম সফল ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই হসপিটালিটি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ ও নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।সংসদীয় আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ড. নজরুল ইসলাম, কেভিন বোনাভিয়া এমপি, স্টিভেনেজ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান টম প্লেটার, রুশানারা আলী এমপি, আপসানা বেগম এমপি, রেচেল হপকিন্স এমপি, লুসি রিগবি এমপি, ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিশ অ্যান্ড চিপস-এর প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু ক্রুক, ন্যাশনাল ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি হেনরি পল্টনি এবং ব্রিটিশ কাবাব অ্যাওয়ার্ডসের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম দোগুস।এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন সভাপতি বিসিএ এম এ মুনিম ওবিই, প্রাক্তন সভাপতি বিসিএ এম কামাল ইয়াকুব, বিসিএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ফয়জুল হক, সুরুক মিয়া, মসুদ আহমেদ, মানিক মিয়া, শেফ অনলাইন এম এ মুনিম সালিক, ইউকেবিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি নাজমুল ইসলাম নুরু, প্রাক্তন সভাপতি বিবিসিসিআই বশির আহমেদ, প্রাক্তন বিসিএ সিনিয়র সহ-সভাপতি, আবদুল মাহতাব, সাবেক সহ-সভাপতি, ওবিসিএ-এর প্রাক্তন সহ-সভাপতি, ওবায়দুল কাদের প্রমুখ। নাসির উদ্দিন, শামসুল আলম খান সাহিন, তারেক উদ্দিন, দিলওয়ার আহমেদ, গোলাম খান নুরানী, পরিচালক ইউকেবিসিসিআই জোমিরুল ইসলাম সিরাজ, আবদুস সুফহান, কুদ্দুস আলী, জাকারিয়া চৌধুরী, ক্যাটারার্স সিরাজ আলী, ডাঃ কৃষক আলী, ইঞ্জিনিয়ার সাদিকুল আলম, সৈয়দ ফুল মিয়া প্রমুখ। উপস্থিত অতিথিবৃন্দ ব্রিটিশ কারি শিল্পের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার, শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও নিয়মিত সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিসিএর প্রেসিডেন্ট অলি খান এমবিই বলেন,ব্রিটিশ কারি শিল্প কেবল যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বড় অবদানকারীই নয়, এটি ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অনেক ব্যবসায়ী এখন এমন মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছেন যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সক্ষমতাকে হুমকিতে ফেলছে। আমরা সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি। শ্রম-সংকট, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং প্রবৃদ্ধির বাধাগুলো মোকাবেলায় শিল্পের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করুন। বিসিএর জেনারেল সেক্রেটারি মিঠু চৌধুরী বলেন, এই সংসদীয় আলোচনা সভা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, নীতিনির্ধারক ও কারি শিল্পের বিশিষ্ট নেতাদের একত্রিত করে গ্রেট ব্রিটিশ কারি শিল্পের সংকটের সমাধান খোঁজার সুযোগ। দশকের পর দশক ধরে এই খাত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং হসপিটালিটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। তাই আমাদের উদ্বেগগুলো যাতে শোনা যায় এবং কার্যকর সমাধান খোঁজা হয়, সেটি এখন অপরিহার্য। বিসিএ সংসদ সদস্য ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করে এই শিল্পের জন্য একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিসিএর চিফ ট্রেজারার টিপু রহমান বলেন, “গ্রেট ব্রিটিশ কারি শিল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যুক্তরাজ্যের হসপিটালিটি খাতের মূল ভিত্তি, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে এর অবদান অপরিসীম। তবে ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয়, কর্মী সংকট ও আর্থিক চাপে এই খাত এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই সংসদীয় আলোচনা নীতিনির্ধারকদের সাথে সরাসরি সংলাপ ও বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন তার সদস্যদের সহায়তা এবং এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। মূল সমস্যাসমূহ ও বিসিএর দাবি কর্মসংস্থান ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি বিসিএ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে: হসপিটালিটি ব্যবসার জন্য বিজনেস রেট রিলিফ বাড়ানো•ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে (এসএমই) প্রভাবিত করা জাতীয় বিমা চাঁদা বৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করা•হসপিটালিটি ব্যবসায়ীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি সহায়তা প্রকল্প চালু করা• উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে কর প্রণোদনা দেওয়া কর্মী ও দক্ষতার সংকট দক্ষ শেফ ও হসপিটালিটি কর্মীর তীব্র সংকট এখনও অব্যাহত। বয়স্ক কর্মীবাহিনী এবং দেশীয় নিয়োগের অপ্রতুলতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বিসিএ দাবি জানিয়েছে:•হসপিটালিটি বা বিশেষজ্ঞ শেফদের জন্য একটি পৃথক ভিসা রুট •ইমিগ্রেশন স্যালারি লিস্টে বিশেষজ্ঞ কারি শেফদের অন্তর্ভুক্তি•হসপিটালিটি শিক্ষানবিশতা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে সহায়তা বৃদ্ধি•দেশীয় প্রতিভা গড়ে তুলতে শিল্প-পরিচালিত দক্ষতা একাডেমির জন্য অর্থায়ন উত্তরাধিকার ও ব্যবসায়িক টেকসই উন্নয়ন পারিবারিক মালিকানাধীন অনেক রেস্তোরাঁ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুখে, কারণ নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই খাতে আসার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বিসিএর সুপারিশ:•পারিবারিক মালিকানাধীন এসএমইগুলোর জন্য অনুদান ও পরামর্শমূলক সহায়তা •ব্যবসা হস্তান্তর, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা ও আধুনিকায়নের জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্যারিয়ার ভাবমূর্তি কারি শিল্পের নেতৃবৃন্দ হসপিটালিটি সেবাকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে প্রচারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। বিসিএর সুপারিশ:
•স্কুল, কলেজ ও জব সেন্টারের মাধ্যমে হসপিটালিটি ক্যারিয়ার প্রচার•শিক্ষানবিশতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অর্থায়ন বৃদ্ধি•শিল্প সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করে হসপিটালিটি ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগগুলো তুলে ধরা
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পের আধুনিকায়ন বিসিএর দাবি:
•ডিজিটাল রূপান্তর ও উৎপাদনশীলতা উন্নয়নে অনুদান
•ব্রিটিশ কারি সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক প্রচারে পর্যটন ও রপ্তানি উদ্যোগে বৃহত্তর সহায়তা•সরকার ও শিল্পের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক হসপিটালিটি সেক্টর কাউন্সিল গঠন ভ্যাট-সংক্রান্ত উদ্বেগ কারি শিল্প প্রতিনিধিরা বর্তমান ২০% ভ্যাট হারের নেতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তাদের মতে, উচ্চ শ্রম ব্যয়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয়ের সম্মিলিত চাপে অনেক ব্যবসার আর্থিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিসিএ সরকারকে হসপিটালিটি খাতের ব্যবসার জন্য হ্রাসকৃত ভ্যাট হার বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। যাতে চাকরি রক্ষা পায়, বিনিয়োগ উৎসাহিত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহায়তা পায়। কারি শিল্পের স্বীকৃতির দাবি বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন ইউকে জোর দিয়ে বলেছে যে কারি শিল্প প্রতি বছর যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে কোটি কোটি পাউন্ড যোগ করছে, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে, পর্যটন আকর্ষণ করছে এবং ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়েছে। বিসিএর সার্বিক দাবি হলো, সরকার যেন কারি শিল্পকে ব্রিটেনের হসপিটালিটি খাত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং শিল্পের স্টেকহোল্ডারদের সাথে মিলে এর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কাজ করে। বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন ইউকে নেতৃবৃন্দ এই গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী সকল সংসদ সদস্য, অতিথি, শিল্প প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। বিসিএ বিশ্বাস করে, সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে গ্রেট ব্রিটিশ কারি শিল্পের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী, টেকসই ও সমৃদ্ধ হবে। বিসিএ সম্পর্কে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ) বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রায় ১২ হাজার রেস্টুরেন্ট ও টেকওয়ে ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিত্ব করছে। সংগঠনটি ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, কর্মশক্তি উন্নয়ন, শিল্পমান রক্ষা এবং রেস্টুরেন্ট, টেকওয়ে ও অন্যান্য হসপিটালিটি খাতের নীতিগত বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে।










