আবহাওয়া

১২ আগস্ট আকাশে বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ, বাংলাদেশে দেখা যাবে না—পূর্ণগ্রাস থাকবে আড়াই মিনিটেরও কম।

ডেক্স রিপোর্টঃ
আগামী ১২ আগস্ট ২০২৬ আকাশে দেখা যাবে বছরের অন্যতম বিরল মহাজাগতিক ঘটনা—পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে ফেলবে। ফলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে দিনের আলো হঠাৎ কমে গিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য রাতের মতো অন্ধকার নেমে আসবে। তবে বাংলাদেশের আকাশ থেকে এবারের সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, ১২ আগস্টের এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পূর্ণগ্রাসের সরু পথটি অতিক্রম করবে উত্তর রাশিয়া, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং পর্তুগালের একটি ছোট অংশ। এসব অঞ্চলের নির্দিষ্ট স্থান থেকে চাঁদকে সূর্যের সামনে সম্পূর্ণভাবে অবস্থান করতে দেখা যাবে। বাংলাদেশ থেকে কেন দেখা যাবে না? বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ এলাকা এবারের গ্রহণের দৃশ্যমান অঞ্চলের বাইরে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রহণের মূল পর্যায়টি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাতের মধ্যে ঘটবে।NASA-র জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব সময় (UTC) অনুসারে গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় হবে প্রায় ১৭টা ৪৫ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে। বাংলাদেশ সময় UTC-এর চেয়ে ৬ ঘণ্টা এগিয়ে হওয়ায় এটি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী প্রায় রাত ১১টা ৪৫ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে পড়ে। ওই সময় বাংলাদেশে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর রাত থাকবে। ফলে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি সূর্যগ্রহণ দেখার কোনো সুযোগ নেই। কোথায় দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস? ১২ আগস্টের গ্রহণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা যাবে পূর্ণগ্রাসের পথে থাকা অঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে—আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল, পর্তুগালের উত্তর-পশ্চিমের ছোট একটি অংশ,উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের নির্দিষ্ট এলাকা এর বাইরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার কিছু এলাকায় সূর্যগ্রহণের আংশিক পর্যায় দেখা যাবে। NASA জানিয়েছে, উত্তর গোলার্ধের বিস্তীর্ণ এলাকায় আংশিক সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হবে। কখন শুরু হবে?জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে বিশ্বব্যাপী সূর্যগ্রহণের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়া শুরু করবে ১২ আগস্ট বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিট UTC-এর দিকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট শহর থেকে গ্রহণ শুরুর সময় এক হবে না। স্থানভেদে গ্রহণ শুরু, সর্বোচ্চ গ্রহণ এবং শেষ হওয়ার সময় পরিবর্তিত হবে। পূর্ণগ্রাসের সবচেয়ে দীর্ঘ পর্যায় হবে প্রায় ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড। NASA-র হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাসের সর্বোচ্চ স্থায়িত্বের স্থানটি উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে, প্রায় ৬৫°৫০′ উত্তর অক্ষাংশ ও ২৫°২৯′ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে। সেখানে পূর্ণগ্রাসের স্থায়িত্ব হবে প্রায় ২ মিনিট ১৮ দশমিক ২ সেকেন্ড। বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সময় NASA-র প্রকাশিত স্থানীয় সময় অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাসের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যায় দেখা যাবে আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে। সেখানে আংশিক গ্রহণ শুরু হবে বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে, পূর্ণগ্রাস শুরু হবে ৫টা ৪৮ মিনিটে, পূর্ণগ্রাস শেষ হবে ৫টা ৪৯ মিনিটে এবং আংশিক গ্রহণ শেষ হবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে।স্পেনের লিয়ন শহরে আংশিক গ্রহণ শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টা ৩২ মিনিটে। পূর্ণগ্রাস শুরু হবে রাত ৮টা ২৮ মিনিটে এবং শেষ হবে ৮টা ৩০ মিনিটে। এরপর আংশিক গ্রহণ চলবে রাত ৯টা ২২ মিনিট পর্যন্ত। ভ্যালেন্সিয়া শহরে আংশিক গ্রহণ শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টা ৩৮ মিনিটে, পূর্ণগ্রাস শুরু হবে রাত ৮টা ৩২ মিনিটে এবং পূর্ণগ্রাস শেষ হবে ৮টা ৩৩ মিনিটে। স্থানীয় সূর্যাস্তের কারণে সেখানে আংশিক গ্রহণের শেষ পর্যায় পুরোপুরি দেখা নাও যেতে পারে। সর্বোচ্চ গ্রহণ কোথায়? NASA-র জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা অনুযায়ী, গ্রহণের সর্বোচ্চ মুহূর্ত হবে ১৭:৪৫:৫৩.৮ UTC-এ। তখন সূর্যের উচ্চতা থাকবে প্রায় ২৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং পূর্ণগ্রাসের পথের প্রস্থ হবে প্রায় ২৯৪ কিলোমিটার। সর্বোচ্চ গ্রহণের কেন্দ্রে পূর্ণগ্রাসের স্থায়িত্ব প্রায় ২ মিনিট ১৮ দশমিক ২ সেকেন্ড।বাংলাদেশ সময়ের হিসাবে সর্বোচ্চ গ্রহণের মুহূর্তটি প্রায় রাত ১১টা ৪৫ মিনিট ৫৪ সেকেন্ড। কিন্তু তখন বাংলাদেশে সূর্য আকাশে থাকবে না। তাই বাংলাদেশ থেকে এ দৃশ্য সরাসরি দেখা সম্ভব নয়।কেন হয় সূর্যগ্রহণ? সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে এবং চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে। চাঁদের ছায়ার যে সরু অংশে সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যায়, সেখানে দেখা যায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। আর ছায়ার বাইরের অংশে সূর্যের কিছু অংশ ঢাকা পড়ে—সেখানে দেখা যায় আংশিক সূর্যগ্রহণ। ১২ আগস্টের গ্রহণে চাঁদ সূর্যের চাকতি পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে বলে পূর্ণগ্রাসের পথে থাকা মানুষ কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখবেন। NASA জানিয়েছে, পূর্ণগ্রাসের সময় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যায় এবং তখনই সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা দেখার বিরল সুযোগ তৈরি হয়। খালি চোখে দেখা যাবে কি? বাংলাদেশ থেকে সরাসরি গ্রহণ দেখা যাবে না। তবে যেসব দেশে আংশিক বা পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে, সেখানে সূর্যের দিকে তাকানোর সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। NASA-র নির্দেশনা অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাসের সময় সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি সম্পূর্ণভাবে চাঁদে ঢাকা পড়লে অল্প সময়ের জন্য সরাসরি তাকানো নিরাপদ হতে পারে। কিন্তু পূর্ণগ্রাস শুরু হওয়ার আগে ও শেষ হওয়ার পর সূর্যের দিকে সরাসরি তাকানো চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। তাই আংশিক গ্রহণ দেখার সময় অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সোলার ভিউয়িং গ্লাস/সোলার ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ সানগ্লাস দিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখা নিরাপদ নয়।বাংলাদেশে আকাশপ্রেমীদের করণীয় বাংলাদেশ থেকে ১২ আগস্টের সূর্যগ্রহণ সরাসরি দেখা সম্ভব না হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন সম্প্রচারের মাধ্যমে গ্রহণের দৃশ্য দেখতে পারবেন। NASA-সহ বিভিন্ন সংস্থা এ ধরনের মহাজাগতিক ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে দৃশ্যমান হলেও এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বৈশ্বিক। গ্রহণের সময় সূর্যের করোনা পর্যবেক্ষণ, সৌর বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণা এবং পৃথিবী-চাঁদ-সূর্যের পারস্পরিক অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যায়। সব মিলিয়ে ১২ আগস্ট ২০২৬-এর পূর্ণ সূর্যগ্রহণ মহাকাশপ্রেমীদের জন্য একটি বিরল ও আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনা। তবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য এবারের গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—গ্রহণটি বাংলাদেশে দৃশ্যমান হবে না; পূর্ণগ্রাস দেখতে হলে যেতে হবে গ্রহণের দৃশ্যমান পথের দেশগুলোতে, বিশেষ করে আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া বা স্পেনের নির্দিষ্ট অঞ্চলে। তথ্যসূত্র: NASA, NASA Goddard Space Flight Center

এই বিভাগের আরও খবর

Back to top button