
ডেক্স রিপোর্টঃ
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার ৬ নং চরভৈরবী ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের জালিয়া চর শহর আলীর মোড় মধ্যবাজার গণবসতি এলাকায় একটি পুকুর ভরাট করে বালু বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার মধ্যে এমন উদ্যোগে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকশ পরিবারের বসবাসের এই এলাকায় বসতঘরের একেবারে কাছাকাছি একটি পুকুর ভরাট করে সেখানে বালু মজুত ও বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কয়েকবার পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অভিযোগ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। এলাকাবাসী বলছেন, মধ্যবাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে বালু ব্যবসা শুরু হলে প্রতিদিন ভারী যানবাহন চলাচল, বালু ওঠানামা, ধুলাবালি, শব্দদূষণ ও রাস্তার ক্ষতির কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ব্যক্তি ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবেরও আশঙ্কা স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চর আবাবিল ইউনিয়নের বাসিন্দা মিজান ঢালী ওই এলাকায় বালু উত্তোলন ও ব্যবসার উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির ছত্রছায়ায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ও বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। এলাকাবাসী বলছেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব ব্যবহার করে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে না।তাদের দাবি, বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে না দেখে জনস্বার্থ, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশাসনের তদন্ত করা প্রয়োজন।জমি ভাড়া নিয়েছি’—উদ্যোক্তাদের দাবি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ব্যবসা পরিচালনার জন্য জমি ভাড়া নিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে বালু ব্যবসা হয়ে থাকলে তারাও ব্যবসা করতে পারবেন—এমন বক্তব্য দিয়েছেন তারা।অন্যদিকে অভিযোগকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, জমির মালিক বা ভাড়াটিয়ারা ওই জমিতে বালু ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করলে তাদের আপত্তি নেই। তাদের আপত্তি মূলত ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় বালু উত্তোলন, মজুত ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে। আইন কী বলছে? বাংলাদেশের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০ অনুযায়ী,ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকেও বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইনের ৭ক ধারায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, পরিবেশ বা প্রতিবেশের ক্ষতি সাধিত হওয়ার ক্ষেত্রে এবং এমন পদ্ধতিতে বালু বা মাটি উত্তোলন করলে যাতে পার্শ্ববর্তী জমির ক্ষতি, চ্যুতি বা ধসের সৃষ্টি হয়—সেসব ক্ষেত্রে উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনে সরকারি উন্মুক্ত স্থান, নদীর তলদেশসহ নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।আইন অনুযায়ী, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ফসলি জমি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ হতে পারে। আইন লঙ্ঘন করে বা যথাযথ অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, বালু বা মাটিবাহী যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রয়েছে।এ ছাড়া আইনে এমন পরিস্থিতিতে বালুমহাল বিলুপ্ত ঘোষণার প্রস্তাবের সুযোগও রাখা হয়েছে, যেখানে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, সরকারি বা বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে; একইভাবে বালু পরিবহনে সরকারি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।শিক্ষার্থী ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বালু পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ট্রাক, ট্রাক্টরসহ ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে স্থানীয় সড়কগুলোতে ধুলাবালি ও যানজট বাড়ছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পথচারীদের চলাচলেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।তাদের ভাষ্য, একটি ঘনবসতিপূর্ণ বাজার এলাকায় নিয়মিত বালুবাহী ভারী যান চলাচল শুরু হলে সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।রাস্তার পাশে বালু ছড়িয়ে পড়লে পথচারী ও যানবাহনের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সময় ভারী যানবাহন চলাচল করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে বলে তারা মনে করছেন। এ ছাড়া বালু ওঠানো, নামানো ও পরিবহনের সময় বাতাসে ধুলিকণা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চললে বসতঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।পুকুর ভরাটের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন স্থানীয়রা বলছেন, একটি পুকুর বা জলাধার ভরাট করে তার ওপর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের জায়গা কমে গেলে ভবিষ্যতে সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে ওই পুকুরটি কী ধরনের জলাধার, সেটির মালিকানা ও শ্রেণি কী এবং সেটি ভরাটের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয় সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। প্রশাসনের সরেজমিন তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করা হোক। জমির মালিকানা, জমির শ্রেণি, পুকুর বা জলাধারের প্রকৃতি, বালু উত্তোলন বা মজুতের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি অনুমতি রয়েছে কি না—সবকিছু যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে তারা চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিও জনস্বার্থে বিষয়টি দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব নয়—আইন ও জনস্বার্থের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বালু ব্যবসা বন্ধ হলে এলাকাবাসী স্বস্তি পাবে’ স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তারা কারও বৈধ ব্যবসার বিরোধিতা করছেন না। তাদের মূল দাবি হলো—বসতবাড়ির পাশে এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালিত না হোক, যার কারণে মানুষের বসবাসের পরিবেশ নষ্ট হয়, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে কিংবা ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হয়। তাদের বক্তব্য, “জমিতে অন্য কোনো বৈধ ব্যবসা হলে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু বসতবাড়ির পাশে বালু উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির কারণে যদি কয়েকশ পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই জনস্বার্থসম্মত হতে পারে না। এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং আইনবহির্ভূত কোনো কার্যক্রম থাকলে তা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা চান, ভবিষ্যতে এলাকাটির রাস্তাঘাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিক। এখন দেখার বিষয়—অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রস্তাবিত বালু ব্যবসা আইন ও পরিবেশগত বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।










