রাজশাহী

​রাজশাহীতে এপ্রিল-মে মাসে ১৪ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার।

রাজশাহী প্রতিনিধি:
সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা লেডিস অর্গানাইজেশন ফর সোসাল ওয়েলফেয়ার (লফস)। দীর্ঘদিন যাবৎ নারী ও শিশুদের উন্নয়নে কর্মরত এই সংস্থার ডকুমেন্টেশন সেল রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর সংবাদের ভিত্তিতে নিয়মিত এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশ করে আসছে। লফস জানায়, রাজশাহী অঞ্চলে নারী ও শিশু নির্যাতন পরিস্থিতি বিভিন্ন মাত্রায় অবনতির দিকে যাচ্ছে। সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে যৌতুক ও পরকীয়া। লফসের মতে, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি কিছু টিভি সিরিয়াল সমাজে পরকীয়াকে উৎসাহিত করছে।এছাড়া পারিবারিক কলহ ও প্রেমঘটিত কারণে হত্যা, আত্মহত্যা এবং অমানবিক নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে।এর পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘কিশোর গ্যাং-এর উৎপাত, যার কারণে সমাজে ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। লফসের প্রতিবেদনে গত এপ্রিল ও মে মাসে রাজশাহী অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু অমানবিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বড়কুঠি এলাকায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি, দুর্গাপুর উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামে নিশীলা (২১) নামে এক নারীর প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া, দুর্গাপুর দাউদকান্দি সরকারি কলেজের নারী শিক্ষক আরিয়া খাতুন হীরাকে মারধর, এবং চারঘাট উপজেলায় এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে তার স্ত্রীকে ধর্ষণের লোমহর্ষক ঘটনা।এছাড়া অন্যান্য অপরাধের মধ্যে রয়েছে—বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌরসভার দানগাছি গ্রামে প্রতিবেশীর ৭ মাস বয়সী কন্যা শিশুকে অপহরণ, নগরীর লক্ষীপুর এলাকা থেকে রায়না (১৬) নামে এক প্রতিবন্ধী কিশোরীর নিখোঁজ হওয়া, দুর্গাপুর উপজেলার বাজুখলসী গ্রামে হুমায়রা (৪) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা এবং ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে রাফিদ হোসেন রাফি (১৭) নামের নবম শ্রেণীর এক ছাত্রকে অন্য তিন কিশোর কর্তৃক মারধর। পাশাপাশি, নগরের কাদিরগঞ্জ এলাকা থেকে রিয়ান হোসেন তাহা (১১) নামে এক শিশুকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, যৌতুকের টাকা না পেয়ে নির্যাতন সইতে না পেরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকার হাসিনা খাতুন (২১) এবং বাঘা পৌরসভার কালিক গ্রামের পশ্চিমপাড়া গ্রামে পারিবারিক কলহের জের ধরে শাকিলা আক্তার (২২) নামে দুই নারী আত্মহত্যা করেছেন। মতিহার থানার ধরমপুর এলাকায় মোসাঃ ঋতু খাতুন রিয়া (২২) নামে এক গৃহবধূকে তার স্বামী হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পুঠিয়ায় সাধু ফকিরের আস্তানায় স্বামীর সহযোগিতায় এক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং মাফরোজা বেগম (৩০) নামে এক নারীকে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে বোয়ালিয়া থানার ওসির বিরুদ্ধে।লফসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে রাজশাহী জেলায় মোট ১৪ জন নারী ও শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ১ জন শিশু ও ১ জন নারী (মোট ২ জন)। পারিবারিক কলহ ও যৌতুকের কারণে আত্মহত্যা করেছে ২ জন নারী। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২ জন নারী। এছাড়া নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ জন শিশু ও ৪ জন নারী (মোট ৫ জন)। নিখোঁজ হয়েছে ১ জন শিশু, অপহৃত হয়েছে ১ জন শিশু এবং অপহরণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১ জন শিশু। সব মিলিয়ে এই দুই মাসে ৫ জন শিশু এবং ৯ জন নারীসহ মোট ১৪ জন অপরাধের শিকার হয়েছে। লফসের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক মহিলা কমিশনার শাহানাজ পারভীন লাকি বলেন, “সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও সমাজে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায় বা যার কোনো তথ্য জানা যায় না। সেই বাস্তবতায় রাজশাহীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের এই প্রকাশিত তথ্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং সবার জন্য উদ্বেগজনক। তিনি রাজশাহীসহ সারাদেশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে এবং সমাজে অপরাধের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। লফস সকল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

Back to top button