রায়পুরে বিদ্যুৎ-ভোগান্তিতে ২৪ হাজার গ্রাহক ৬৪২ কিলোমিটার লাইনে কর্মী মাত্র ৪ জন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া।


একরাম হোসেন রায়পুরঃ
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেন নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া, আবার চলে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা—এমন পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হায়দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের আওতাধীন প্রায় ২৪ হাজার গ্রাহক। বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও খামারেও এর প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশাল এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার তুলনায় জনবল অত্যন্ত কম। হায়দরগঞ্জ তথ্যকেন্দ্রের আওতায় তিনটি ইউনিয়ন ও তিনটি ফিডারে প্রায় ৬৪২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে। বিপুল এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও ত্রুটি মোকাবিলায় বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র চারজন কর্মী। আগে কর্মী ছিলেন ছয়জন।
ফলে কোনো এলাকায় লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, সমস্যার উৎস শনাক্ত করা এবং মেরামত করতে সময় লাগছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া
রায়পুরের ১ নম্বর উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কখনো এক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না।
কখনো লাইনে ত্রুটি, কখনো তার ছিঁড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ জানানো হলেও একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসায় স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকেরা।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, “আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিই। তাহলে সেই অনুযায়ী সেবা পাব না কেন? আগে হারিকেনের সময়ও যেন ভালো ছিলাম। এখন ডিজিটাল যুগে এসেও যদি বিদ্যুতের জন্য আবার হারিকেন ধরতে হয়, তাহলে আমাদের কী লাভ?”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করলে অনেক সময় দুই-তিন দিন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকে। এরপর আবারও শুরু হয় ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া। ফলে বারবার অভিযোগ করেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
অভিযোগ জানাতেও ভোগান্তি
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি ত্রুটি দেখা দিলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হায়দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ইনচার্জ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার কথা জানাতে চাইলেও অনেক সময় ফোনে সাড়া পাওয়া যায় না। কখনো ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, আবার কখনো রিং হলেও কল রিসিভ করা হয় না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
তাদের দাবি, লাইনের কোথাও ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত জানানো জরুরি। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা না গেলে সমস্যার স্থান শনাক্ত করে দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, জরুরি সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর জানাতেই যদি বারবার ফোন করতে হয়, আর ফোনে সাড়া না পাওয়া যায়, তাহলে গ্রাহকেরা সমস্যার কথা জানাবেন কার কাছে?
চার কর্মীতে ৬৪২ কিলোমিটার লাইন
হায়দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ২৪ হাজার গ্রাহকের জন্য রয়েছে প্রায় ৬৪২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন। তিনটি ইউনিয়ন ও তিনটি ফিডারজুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কের বিপরীতে বর্তমানে কর্মী মাত্র চারজন।
জনবল সংকটের কারণে একাধিক এলাকায় একই সময়ে সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সব জায়গায় গিয়ে ত্রুটি মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হায়দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমার এখানে লোক আছে মাত্র চারজন। এতগুলো লাইন আমাদের চারজনকে কভার করতে হচ্ছে। এত বড় এলাকার জন্য এই লোকবল যথেষ্ট নয়। হায়দরগঞ্জে আরও লোক দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।”
তার বক্তব্যে জনবল সংকটের বিষয়টি সামনে আসায় স্থানীয়দের দাবিও আরও জোরালো হয়েছে। তাদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ চালু করে সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ।
খামারে বাড়ছে ক্ষতির ঝুঁকি
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পোল্ট্রি ও গবাদিপশুর খামারে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আলো, ফ্যান, পানি সরবরাহসহ খামারের প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা চালু রাখা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন খামারিরা।
পোল্ট্রি খামারি মামুন রশিদ বাকি বলেন, “বিদ্যুতের কারণে আমরা বিপদের মধ্যে আছি। খামারে প্রয়োজনীয় আলো ও অন্যান্য ব্যবস্থা চালু রাখতে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের ক্ষতি হচ্ছে। লাখ লাখ টাকার প্রকল্প ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।”
আরেক পোল্ট্রি খামারি একরাম হোসেন বলেন, খামারে যে পরিমাণ আলো প্রয়োজন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে খামার লোকসানের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে একদিন বয়সী বাচ্চাগুলো প্রয়োজনীয় পরিবেশ না পাওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
গরুর খামারি মো. আবু তাহের বলেন, “গরুর জন্য যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন, বিদ্যুৎ না থাকায় তা সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ঘাস কাটাসহ বিভিন্ন কাজে যান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এক লাখ টাকার বেশি ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মতো খামারিদের পক্ষে খামার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।”
চিকিৎসাসেবায়ও বিপর্যয়
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থানীয় চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। চর আবাবিল ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় প্রায় তিনটি বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান এবং ৭ থেকে ১০টি ডেন্টাল ক্লিনিক বা চেম্বার রয়েছে।
চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা বলেন, “বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী দেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি পরিচালনা করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসক ও রোগী—দুই পক্ষকেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”
তাদের দাবি, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে।
স্থানীয় শিক্ষকরা বলেন, “বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অনেকটাই বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিনির্ভর। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও এর প্রভাব পড়ে।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পড়তে বসার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আসবে তার নিশ্চয়তা থাকে না। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দোকানপাট, ফটোকপি, কম্পিউটার, অনলাইন সেবা ও অন্যান্য বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার চালকেরাও সমস্যায় পড়ছেন। সময়মতো ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় অনেক চালক কাজে বের হতে পারছেন না। এতে তাদের দৈনিক আয় কমে যাচ্ছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি নিয়মিত ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। তাই শুধু সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বারবার কোথায় ও কেন ত্রুটি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে ৬৪২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইনের বিপরীতে মাত্র চারজন কর্মী দিয়ে প্রায় ২৪ হাজার গ্রাহককে কতটা কার্যকরভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, হায়দরগঞ্জে দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ লাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও মেরামত এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাদের প্রশ্ন একটাই—২৪ হাজার গ্রাহকের নিয়মিত বিল আদায় নিশ্চিত করা গেলেও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত হবে কবে?
দ্রুত জনবল সংকট দূর করা না হলে এবং বিদ্যুৎ লাইনের কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে রায়পুরের এই বিদ্যুৎনির্ভর জনপদে ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।










