চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত মহাপরিকল্পনার দাবি নাগরিক ফোরামের।

শহিদুল ইসলাম, প্রতিবেদক:
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগরী। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে চরম ভোগান্তির। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম। সম্প্রতি ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল সভায় বক্তারা বলেন, শুধুমাত্র খাল খনন বা ড্রেন সংস্কার করলেই জলাবদ্ধতার সমাধান সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশন, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।অন্যথায় হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প থেকেও নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না। সভায় অংশ নেন ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ, মহাসচিব মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, ওমান শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, গোলাফুর রহমান, এ কে এম ওসমান গণি, মনসুর আলম, কামরুল ইসলাম, কাজী মো. শহীদুল্লাহ, তসলিম খাঁ, শ ম জিয়াউর রহমান, মোহাম্মদ নূর, সেলিম পাটোয়ারী ও শহীদুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সভায় ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার অভাবে প্রকল্পগুলোর পূর্ণ সুফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করলেও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে কোথাও খাল খনন হচ্ছে, আবার অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই নগরীর খাল ও উপখালগুলোর সংস্কার এবং চলমান উন্নয়নকাজ শেষ করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব খালের ওপর অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ না করলে বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। তিনি জানান, সম্প্রতি সরকার জলাবদ্ধতা ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরবাসী কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। মহাসচিব মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধানে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ২০১৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন ও জনমত গঠন করে আসছে। জলাবদ্ধতা, কালুরঘাট সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ফোরাম সবসময় সোচ্চার রয়েছে এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সভায় বক্তারা আরও বলেন, শুধু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয়ের স্বচ্ছ তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। কোথায় কোথায় এখনও জলাবদ্ধতা হচ্ছে এবং তার কারণ কী—তা চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা। এজন্য বর্ষাকালে সরেজমিন পরিদর্শন, তথ্য সংগ্রহ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়। সভা শেষে গৃহীত এক প্রস্তাবে আগামী ১৫ মে’র মধ্যে চলমান খাল সংস্কার কাজের কারণে নির্মিত অস্থায়ী বাঁধ খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে নগরবাসীকে স্থায়ী সমাধান উপহার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এখন শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সমন্বয়হীন উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে প্রতিবছরই দুর্ভোগ বাড়ছে। তাই টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতামূলক সমন্বিত পরিকল্পনাই হতে পারে এই দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ।

এই বিভাগের আরও খবর

Back to top button