বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর: সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বমানের সেবার সময় এখনই।


মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী, নিজস্ব মতামত:
একটি দেশের বিমানবন্দর কেবল যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়; এটি সেই দেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পেশাদারিত্বের অন্যতম প্রধান প্রতীক। বিদেশ থেকে আসা একজন যাত্রী বিমানবন্দরে পা রেখেই দেশটির সেবা, শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পান। ফলে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিমানবন্দর পরিচালনায় বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য এখন সময়োপযোগী ও কৌশলগত প্রয়োজন।বাংলাদেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, প্রবাসী আয় এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্ব। এই বাস্তবতায় দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবার মান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিচালনাগত দক্ষতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের বিমানবন্দরে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক, পরিচালনা পদ্ধতি, জনবল ব্যবস্থাপনা, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং যাত্রীসেবায় কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা না গেলে সেই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার অপারেটর যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।কেন আন্তর্জাতিক পেশাদার অপারেটর প্রয়োজন? বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বিমানবন্দর পরিচালনায় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তাসংগত কার্যক্রম এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশও বিমানবন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেবার মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের পেশাদার অপারেটর বা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে এর উদ্দেশ্য কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে নির্বিচারে দায়িত্ব তুলে দেওয়া নয়; বরং নির্দিষ্ট কর্মপরিধি, স্বচ্ছ চুক্তি, পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতা এবং কঠোর জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালনব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তোলা।আন্তর্জাতিক অপারেটররা যাত্রী চলাচল ব্যবস্থাপনা, টার্মিনাল পরিচালনা, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, বাণিজ্যিক সুবিধা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সেবা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমানো, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য সহায়ক সেবা সম্প্রসারণেও তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব থাকবে অক্ষুণ্ন। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিমানবন্দরের মালিকানা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। বিমানবন্দরের মালিকানা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতেই থাকবে। নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, আইন প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত অন্যান্য দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অধীনেই পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক অপারেটরের দায়িত্ব হবে চুক্তিতে নির্ধারিত পরিচালনাগত ও সেবাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ।অর্থাৎ, বাংলাদেশের বিমানবন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক দক্ষতা যুক্ত হবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাবে না। এটাই হওয়া উচিত যেকোনো অংশীদারত্বের মৌলিক নীতি। চুক্তি হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ফলাফলভিত্তিক।আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের আগে সম্ভাব্য ব্যয়, আর্থিক সুবিধা, ঝুঁকি, দেশীয় সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে স্বাধীন সমীক্ষা করা জরুরি। এরপর উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক পরিচিতি নয়, তার বাস্তব কর্মদক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভিজ্ঞতাও মূল্যায়ন করতে হবে।চুক্তিতে যাত্রীসেবার মান, অপেক্ষার সময়, ব্যাগেজ সরবরাহের দক্ষতা, পরিচ্ছন্নতা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলো পরিমাপযোগ্য সূচকের আওতায় আনতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে জরিমানা, সংশোধনমূলক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে চুক্তি বাতিলের বিধানও রাখতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তির ব্যয়, সরকারের আর্থিক দায়, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট শর্তগুলো যথাযথভাবে প্রকাশ ও নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত তথ্য, সাইবার নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর তথ্য সুরক্ষায় কঠোর বিধান থাকতে হবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই হবে কার্যকর পথ।প্রথম পর্যায়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ নির্বাচিত বিমানবন্দরের পরিচালনব্যবস্থা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এরপর নির্দিষ্ট টার্মিনাল বা সেবাক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে পাইলট প্রকল্প চালু করে ফলাফল যাচাই করা উচিত। সফলতা, ব্যয়-সাশ্রয়, যাত্রী সন্তুষ্টি এবং পরিচালনাগত উন্নতির প্রমাণ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্য বিমানবন্দরেও এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় দেশীয় দক্ষ জনবলকে অগ্রাধিকার, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি অপারেটরের ওপর স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি না করে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা বাড়ানোই হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।অবকাঠামোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাতেও বিশ্বমান চাই।বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার অর্থ শুধু দৃষ্টিনন্দন টার্মিনাল নির্মাণ নয়; বরং এমন একটি সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে যাত্রী কম সময়ে, স্বাচ্ছন্দ্যে, নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন। বিমানবন্দর হবে দক্ষতা, প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বাস্তব উদাহরণ। এখন প্রয়োজন আবেগনির্ভর বিতর্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা যেমন কাম্য নয়, তেমনি যাচাই-বাছাই ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব অর্পণও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের নীতিগত অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট।অর্থাৎ, মালিকানা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে থাকবে, আর সেবার মান হবে বিশ্বমানের। বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ যত বাড়বে, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আর্থিক সক্ষমতা সুরক্ষিত রেখে আন্তর্জাতিক পেশাদার অপারেটর যুক্ত করার সম্ভাবনা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি বিশ্বমানের বিমানবন্দর শুধু অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না- এটি গড়ে ওঠে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং যাত্রীকেন্দ্রিক সেবার সমন্বয়ে।










