রাজশাহী প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানকে জেলা পুলিশ রিজার্ভ অফিসার (আরও) হেডকোয়ার্টারে বদলি করা হয়েছে।
গত ১ নভেম্বর রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ মামুন অর রশিদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে জনস্বার্থে তাঁকে বদলি করা হয়। আদেশের স্মারক নম্বর ৩৭১৯(২৬)।
তার বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি থানায় কর্মরত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যের মধ্যেও স্বস্তির প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বদলির আদেশের পর স্থানীয়সহ থানার কয়েকজন কর্মকর্তা ও সদস্যের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে সাধারণ মানুষ ও অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা না রাখার অভিযোগ ছিল ওসি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। তার প্রায় সাত মাসের দায়িত্বকালে উপজেলায় পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এ সময় মাদক কারবারের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৬ এপ্রিল মোহনপুর থানায় যোগদানের পর থেকেই ওসির আচরণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। থানায় সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের একাধিক অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
উপজেলার মৌগাছি বাজার এলাকার গৃহিণী আরেচা অভিযোগ করেন, বিরোধীপক্ষ তাঁর বাড়িঘর ভাঙচুর করলে তিনি বাধা দেন। এ সময় তাঁকে মারধর করে আহত করা হয়। পরে বিচার ও আইনি সহায়তা পেতে থানায় গেলে ওসির কক্ষে তাঁকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিবাদীপক্ষের পক্ষ নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে গালিগালাজ করে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত ৬ আগস্ট স্থানীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন তিনি।
কেশরহাট পৌর এলাকার ব্যবসায়ী আলহাজ মো. শাফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, একটি চোরাই মোটরসাইকেলের সন্ধান দিতে থানায় গেলে ওসি তাঁকে অপমানজনক আচরণ করেন।
উপজেলায় কর্মরত কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে ওসির সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি নির্দিষ্ট এলাকায় মাদক কারবার চলার তথ্য দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভাতেও আলোচনায় এসেছে বলে তাঁরা জানান।
সর্বশেষ গত ৩১ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে থানায় গিয়ে দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন উপজেলার খয়রা গ্রামের সরকারি কলেজের প্রভাষক আব্দুল হাকিম ও মাহবুব নামের আরেক ব্যক্তি। তাঁদের ভাষ্য, আগে উদ্ধার করে থানায় রাখা বাজাজ ১৩৫ সিসির একটি মোটরসাইকেলের বিষয়ে খোঁজ নিতে তাঁরা থানায় যান। এ সময় ওসি তাঁদের দেখে ক্ষুব্ধ হন। পেশা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার পাশাপাশি অপমানজনক কথা বলে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
এ ছাড়া অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে মাসে দুই লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগও উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, এ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে ওসির ভূমিকা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় সাংবাদিকেরা এসব বিষয় তুলে ধরেছেন। স্থানীয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যক্তিগত ও মানবিক সহায়তার প্রত্যাশায় থানায় গিয়েও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ওসির বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ছিল। নিয়মিত বদলির অংশ হিসেবে তাঁকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যোগদানের জন্য বদলি করা হয়েছে।’
তবে বদলির আদেশে জনস্বার্থের কথা উল্লেখ থাকলেও উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কারণে তাঁকে বদলি করা হয়েছে কি না, তা আদেশ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ওসি মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনি সেবা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। তাই শুধু বদলি নয়, মোহনপুর থানায় সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করা, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা এবং ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্পাদক ও প্রকাশক এসএম পারভেজ
ফ: +8801716159137
Email: [email protected]