মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল গোদাগাড়ী প্রতিনিধি
সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ চাকরি নয়; এটি মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাংবাদিকদের বলা হয়—জাতির বিবেক। অবহেলিত, নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের কথা তুলে ধরা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, দুর্নীতির অন্ধকার উন্মোচন করা এবং সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরাই ছিল সাংবাদিকতার মূল শক্তি।
কিন্তু গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ ১১ বছরের পথচলায় আজ একটি প্রশ্ন বারবার মনে জাগে—আমরা আসলে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? তথ্য সংগ্রহে গিয়ে নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিতে কখনো কখনো অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ হয়। যে পরিচয় একসময় আত্মমর্যাদা, দায়িত্ব ও সম্মানের প্রতীক ছিল, সমাজের একটি অংশের কর্মকাণ্ডে সেই পরিচয়ই আজ নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা, ঝুঁকি, ত্যাগ ও প্রতারণার মুখোমুখি হয়েছি। তারপরও নিজের জায়গা থেকে সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা সত্যিই বেদনাদায়ক। পরিচয়পত্র যেন পণ্যে পরিণত না হয় বর্তমানে সাংবাদিকতার অন্যতম বড় সংকট হিসেবে সামনে এসেছে পরিচয়পত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, কিছু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে পরিচয়পত্র বিতরণ করছে। কোথাও আবার যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, লবিং কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তিই হয়ে উঠছে পরিচয় পাওয়ার প্রধান মাধ্যম। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি অনেক অদক্ষ ও অ-পেশাদার ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এতে শুধু সাংবাদিকতার মানই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো পেশার ভাবমূর্তি।
সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয়কে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। যানবাহনে সাংবাদিকতার স্টিকার ব্যবহার করে নিয়ম এড়িয়ে চলা, প্রভাব বিস্তার কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা এর অন্যতম উদাহরণ। সাংবাদিকতার পরিচয় কখনোই আইন অমান্য করার লাইসেন্স হতে পারে না। বরং একজন সাংবাদিকের কাছ থেকেই আইনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। পেশার আড়ালে অপরাধের অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোথাও কোথাও অনলাইন পোর্টাল, পত্রিকা কিংবা সাংবাদিকতার পদ-পদবি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও অবৈধ কর্মকাণ্ড আড়াল করার অভিযোগ শোনা যায়। মাদক, চোরাচালান কিংবা অন্য কোনো অপরাধে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার হলে তা শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়—পুরো পেশার জন্যই তা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিং সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, হাসপাতাল, থানা কিংবা সাধারণ মানুষের কাছে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও কম নয়। কোনো অনিয়মের তথ্য থাকলে সাংবাদিকের কাজ হলো তা যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং সত্যকে তুলে ধরা। সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা সাংবাদিকতা নয়; এটি পেশার অপব্যবহার। দালালি ও মধ্যস্থতার অভিযোগ
প্রশাসন, থানা, পৌরসভা, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস কিংবা বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সাংবাদিক পরিচয়ে মধ্যস্থতা করার প্রবণতাও সাংবাদিকতার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একজন সাংবাদিকের শক্তি হওয়া উচিত তার কলম ও সত্য প্রকাশের সাহস—কোনো দপ্তরে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার নয়। কপি-পেস্ট ও তথ্য চুরি সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান ছাড়া শুধু অন্যের প্রকাশিত সংবাদ কপি করে নিজের নামে প্রকাশের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। একজন প্রতিবেদকের মাঠপর্যায়ের শ্রম, তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও সময় ব্যয় করে তৈরি প্রতিবেদন হুবহু কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া শুধু অনৈতিকই নয়, পেশাগতভাবেও অত্যন্ত নিন্দনীয়। প্রযুক্তির যুগে সংবাদ দ্রুত প্রকাশ করা প্রয়োজন হলেও দ্রুততার চেয়ে তথ্যের সত্যতা,মৌলিকতা ও দায়িত্বশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্যকে আড়াল করে স্বার্থ হাসিল কখনো কখনো ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থে সত্যকে আড়াল করা অথবা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগও সামনে আসে। সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব যেখানে সত্য অনুসন্ধান, সেখানে কোনো পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য তথ্য বিকৃত করা পেশাটির নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে। রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সাংবাদিকের রাজনৈতিক মতামত থাকতেই পারে, কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই এবং পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।সবচেয়ে বড় সংকট—নৈতিক নেতৃত্বের অভাব সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যাদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা পেশাগত ও নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার কথা, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে পেশার নীতি বিসর্জন দিচ্ছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। কোনো ঘটনা অনুসন্ধান করতে জুনিয়র সাংবাদিককে মাঠে পাঠিয়ে পরে অর্থ, প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সেই সংবাদ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে তা সাংবাদিকতার জন্য ভয়াবহ সংকেত। তারপরও আশার জায়গা আছে এতসব সংকটের মধ্যেও অসংখ্য সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক এখনো মাঠে কাজ করছেন। তারা ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করছেন, মানুষের কথা বলছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন এবং কোনো ব্যক্তিগত সুবিধার প্রত্যাশা ছাড়াই পেশার মর্যাদা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের কারণেই সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। পেশায় অনৈতিকতার উপস্থিতি থাকলেও তাই সব সাংবাদিককে একই চোখে দেখা উচিত নয়। যারা সততা, নীতি ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের মূল্যায়ন ও সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। এখনই প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি সাংবাদিকতার হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথম কাজটি সাংবাদিক সমাজের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে। ভুয়া পরিচয়ধারী, চাঁদাবাজ, ব্ল্যাকমেইলার কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলকারীদের বিরুদ্ধে পেশাগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়োগ, পরিচয়পত্র প্রদান ও সাংবাদিকতার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিকতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রবীণ ও সিনিয়র সাংবাদিকদেরও এগিয়ে এসে তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ শুধু নতুন প্রযুক্তি বা নতুন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে না; এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার ওপর। পচন যত গভীরই হোক, সত্যকে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।অপসাংবাদিকতার ভিড়েও প্রকৃত সাংবাদিকতা বেঁচে থাকবে—যদি সৎ সাংবাদিকরা নিজেদের নীতি থেকে সরে না যান এবং পেশার ভেতরের অনিয়মের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ান।সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত ক্ষমতার ঢাল নয়; এটি মানুষের কথা বলার দায়িত্ব। তাই এখনই সময় সাংবাদিকতার হারানো গৌরব ও মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার। সময় এসেছে ভুয়া পরিচয়, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্বার্থান্বেষী প্রবণতার বিরুদ্ধে পেশাগতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। সাংবাদিকতার সম্মানিত প্রবীণ, সিনিয়র সাংবাদিক, অভিজ্ঞ অভিভাবক ও পেশাদার সহকর্মীদের প্রতি আহ্বান—পেশার মান, মর্যাদা ও নৈতিকতা রক্ষায় বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা বাস্তবতার আলোকে এই লেখাটি তুলে ধরা হলো। কোনো বক্তব্য বা বিশ্লেষণে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ ও গঠনমূলক সমালোচনা সাদরে গ্রহণযোগ্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক এসএম পারভেজ
ফ: +8801716159137
Email: [email protected]