মোঃ সোহেল নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
২০২৬ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও আমাদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। আবু সাঈদের মতো তরুণেরা যখন বুক পেতে দিয়ে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন পুরো জাতি একটি মোহনায় এসে মিলিত হয়েছিল। সেই সময় কোনো দল, কোনো গোষ্ঠী বা কোনো ব্যক্তিগত মতাদর্শ বড় হয়ে ওঠেনি; বড় হয়ে উঠেছিল শুধু‘মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। আবু সাঈদের আত্মদান সেই ঐক্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে আজ প্রশ্ন করতে হচ্ছে—সেই রক্তে কেনা ঐক্য কীভাবে এত দ্রুত রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল? ঐক্যের ভাঙনের নেপথ্য পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
ঐক্য ভাঙার মূলে ছিল ক্ষমতার উচ্চাভিলাষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের পর যে জনমত তৈরি হয়েছিল, তার সুসংহত কোনো রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। পরিসংখ্যান বলছে, ওই সময়কার জনমত জরিপগুলোতে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ‘জননিরাপত্তা ও স্বচ্ছ শাসন-কে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডায় ‘নির্বাচনের সময়কাল’ বা‘ক্ষমতা প্রাপ্তির কৌশল’ ছিল ৯২ শতাংশেরও বেশি প্রাধান্যপ্রাপ্ত। এই বিশাল ফারাকই প্রমাণ করে যে, দলগুলো জনগণের প্রত্যাশাকে নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক টিকে থাকাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। সংস্কার বনাম ক্ষমতা: দ্বৈরথের রাজনীতি
সংস্কারের এজেন্ডাগুলো যখন টেবিলে এসেছে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো তা জনকল্যাণের চশমা দিয়ে দেখেনি। বিএনপির মতো দলগুলো যখন পরিস্থিতির চাপে পড়ে সংস্কারে একাত্মতা প্রকাশ করেছে, তখন তা জনগণের কাছে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানের সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যেও ক্ষমতার বলয়ে অবস্থান তৈরির প্রবণতা দেখা দেয়। এই বহুমুখী টানাপোড়েনে ঐক্য ভেঙে পড়ে। ফলে যে তরুণ প্রজন্ম আবু সাঈদের ডাকে রাস্তায় নেমেছিল, তারা দেখতে পায় তাদের ত্যাগকে পুঁজি করে পুরনো খেলার ছকই পুনরায় সাজানো হচ্ছে। প্রতারণার দহন ও জনমনে বিভ্রান্তি ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭২ এবং ১৯৯০ সালের পরে আমাদের দেশের মানুষ যে প্রতারণার শিকার হয়েছিল, এবারও যেন তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর সাধারণ জনগণের আস্থার সূচক অন্তত ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই আস্থাহীনতা কেবল কোনো নির্দিষ্ট সরকারের ব্যর্থতা নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে‘অবিশ্বাস’ জেঁকে বসার লক্ষণ।সাধারণ মানুষের কণ্ঠে আজ সেই চেনা দীর্ঘশ্বাস—"আমরা কি আবারও প্রতারিত হচ্ছি?"সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ ও আইনি সুরক্ষা নোট একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষতগুলো চিহ্নিত করা। এই নিবন্ধটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে লেখা নয়, বরং ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির’ একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। আইনের দৃষ্টিতে এটি ‘জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা’ (Fair Comment on Matters of Public Interest)। এখানে কোনো মানহানিকর বক্তব্য বা উসকানিমূলক তথ্য প্রদান করা হয়নি। বরং ইতিহাসের দায়বদ্ধতা থেকে এবং আবু সাঈদের মতো শহীদদের প্রতি সম্মানের জায়গা থেকে এই বিশ্লেষণটি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হলো। গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে জবাবদিহিতা। ক্ষমতার মোহে যারা সেই রক্তাক্ত ঐক্যের মর্যাদা ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য। এখনো সময় আছে, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রকে সংস্কারের এবং রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী করার। নতুবা ইতিহাসের পাতা আবারও বলবে—আমরা পেয়েছিলাম এক অনন্য সুযোগ, কিন্তু ক্ষমতার মোহে তা বিসর্জন দিয়েছি।
সম্পাদক ও প্রকাশক এসএম পারভেজ
ফ: +8801716159137
Email: [email protected]