স্টাফ রিপোর্টার চাঁদপুরঃ
হিসাব যেখানে অস্বচ্ছ, সেখানে আস্থার সংকট অনিবার্য”—চাঁদপুরের ভাঙারি ব্যবসা খাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ব্যবসায়ী সংগঠনকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ যেন সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। জেলার ভাঙারি ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র সংগ্রাহক, হকার ও পথশিশুদের কল্যাণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি সমিতির অর্থ ব্যবস্থাপনা, চাঁদা আদায়, তহবিল পরিচালনা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে সদস্যদের একাংশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।জানা গেছে, চাঁদপুর শহরের নতুন বাজার-বকুলতলা এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভাঙারি ব্যবসায়ী সমিতিটি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে মাসিক ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হতো বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, তহবিলের বর্তমান অবস্থা কিংবা সদস্য কল্যাণে ব্যয়ের সুস্পষ্ট তথ্য অধিকাংশ সদস্যের কাছে নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, ভাঙারি ব্যবসার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর, হকার ও সংগ্রাহকদের শ্রমের ওপর। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে পরিত্যক্ত বোতল, প্লাস্টিক, লোহা ও বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে তারা ব্যবসার সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখে। অথচ তাদের কল্যাণে গঠিত সংগঠন থেকে তারা প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সমিতির সদস্য হেদায়েতুল্লাহ বলেন, বছরের পর বছর চাঁদা দিয়েছি, কিন্তু সংগঠনের কাছ থেকে বাস্তব কোনো সহযোগিতা পাইনি। সংগঠন আছে, কিন্তু সদস্যদের কল্যাণে দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। বাবুরহাট এলাকার ব্যবসায়ী তাফাজ্জল হোসেন তাফু দেওয়ান জানান, মাসিক চাঁদা আদায়ের বিষয়টি দীর্ঘদিনের প্রচলন হলেও সংগঠনের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি বিভিন্ন খাতে খরচ হয়, কিন্তু বিস্তারিত হিসাব কখনো সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। ওয়ারলেস বাজারের ব্যবসায়ী মনির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা আদায় হলেও কোনো নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিবেদন দেখিনি। ব্যবসায়ীরা নানা সময়ে সমস্যায় পড়লেও সংগঠন থেকে কার্যকর সহায়তা মেলে না। অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। একই এলাকার ব্যবসায়ী ফরহাদ মিয়া মনে করেন, সংগঠনটি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। তিনি বলেন, “যাদের শ্রমের ওপর এই ব্যবসা দাঁড়িয়ে আছে, সেই সংগ্রাহক, পথশিশু ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো কল্যাণ তহবিল, স্বাস্থ্যসেবা বা জরুরি সহায়তা কার্যক্রম নেই। অথচ তাদের ঘাম ও শ্রমের মূল্যেই এই খাত আজ কোটি টাকার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সমাজের অবহেলিত শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় একটি সম্ভাবনাময় খাত নানা সামাজিক সমস্যার উৎসে পরিণত হতে পারে। অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আবেগঘন বক্তব্য এসেছে রাজুর বাবার কাছ থেকে, যিনি একসময় নিজেও ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি দাবি করেন, তার সন্তান অসুস্থ অবস্থায় সংগঠনের সহযোগিতা চাইলেও আশ্বাস ছাড়া বাস্তব কোনো সহায়তা পাননি। তার ভাষায়, “চাঁদা নেওয়ার সময় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মানুষ পাওয়া যায় না। তবে সংগঠন সম্পর্কে ভিন্ন মতও রয়েছে। স্বর্ণখোলা এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, “সমিতি বিভিন্ন সময় সদস্যদের সহায়তা করেছে। সব অভিযোগের সঙ্গে আমি একমত নই। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার।অভিযোগের বিষয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিন্টু মিয়া বলেন, “কিছুদিন ধরে সংগঠনের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সমিতির সভাপতি সাব্বির হোসেন বলেন, “সংগঠনটি ব্যবসায়ীদের ঐক্য, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে কার্যক্রম সীমিত হলেও অতীতের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে নতুন কমিটি গঠন করা হবে। তবে দীর্ঘদিনের চাঁদা আদায়ের পরও সংগঠনের তহবিলে বর্তমানে কোনো অর্থ নেই বলে সভাপতির বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সদস্যদের একাংশের দাবি, সংগঠনের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ এবং স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে আনা হোক। এ বিষয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফয়েজ আহমেদ বলেন, “এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিষয়টি শুধু একটি সংগঠনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সংগ্রাহক ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং আস্থার প্রশ্ন। তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে সদস্যদের নিয়ে সাধারণ সভা, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা, তহবিলের হিসাব প্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাঙারি খাত দেশের পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতকে সুশৃঙ্খল ও আধুনিক করতে হলে শ্রমজীবী সংগ্রাহকদের সামাজিক নিরাপত্তা, শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মাদকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংগঠনগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।সংগঠন ব্যক্তির নয়, সদস্যদের; আর তহবিল কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি একটি সম্মিলিত আমানত।—এমন মন্তব্য করে সচেতন মহল বলছে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
সম্পাদক ও প্রকাশক এসএম পারভেজ
ফ: +8801716159137
Email: [email protected]