শহিদুল ইসলাম প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় দৃশ্যমান সাফল্যের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির বিস্তৃত উন্নয়ন আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করেছে। তবে এই অগ্রগতির মাঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত।ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই—যিনি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অবস্থিত নিউ হোপ গ্লোবালের চেয়ারম্যান—মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিরাপত্তা অবকাঠামোকে উন্নয়নের সমান্তরালে গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক প্রকৌশল পরিকল্পনায় নির্মিত ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে তুলনামূলকভাবে অধিক নিরাপদ হতে পারে। মাটির স্বাভাবিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব স্থাপনা নড়ে, ফলে উচ্চ ভবনের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কম থাকে। উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত আধুনিক বাঙ্কারগুলোতে শক-অ্যাবজরবিং প্রযুক্তি, শক্তিশালী রিইনফোর্সড কাঠামো, নিরাপদ বায়ুচলাচল, বিকল্প বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকে। এসব অবকাঠামো শুধু আশ্রয়স্থল নয়, বরং সংকটকালীন কার্যকর কমান্ড সেন্টার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত নিরাপদ টানেল ব্যবস্থার নজির রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তর, নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এর মূল লক্ষ্য। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেও দেখা যায়, প্রাচীন রাজা-সম্রাটদের সময়েও গোপন সুরঙ্গ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল—যা আধুনিক যুগে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও কার্যকর রূপ পেয়েছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বঙ্গভবন, জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো কেবল প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়—এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভ।কোনো বড় দুর্যোগে যদি একযোগে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।এক্ষেত্রে একটি দূরদর্শী উদ্যোগ হতে পারে—কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সঙ্গে আধুনিক ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নির্মাণ। এসব অবকাঠামো এমনভাবে পরিকল্পিত হতে পারে, যাতে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়। বিকল্প প্রবেশ ও নির্গমন পথ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকা জরুরি।তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা—বিশেষ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি—এই পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। উন্নত জলরোধী প্রযুক্তি, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পিং সিস্টেম এবং বন্যা-সহনশীল নকশা ছাড়া এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে এটি দেশের প্রকৌশল দক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি টেকসই, বাস্তবসম্মত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে।যদিও সমাজের একটি অংশ এ ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরঞ্জিত মনে করতে পারে, তবে বাস্তবতা হলো—ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে। দূরদর্শী নেতৃত্বের দায়িত্ব হচ্ছে সেই ভবিষ্যৎ চাহিদাকে আগেভাগেই অনুধাবন করা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
এ উদ্যোগ কোনো পালানোর পথ নয়; বরং সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার একটি সুসংগঠিত প্রস্তুতি। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে সময়ের প্রয়োজনে এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে—যা এর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ বহন করে।বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন সময় এসেছে নিরাপত্তা অবকাঠামোতেও একই দূরদর্শিতা প্রদর্শনের। উন্নয়ন ও সুরক্ষার এই সমন্বয়ই হতে পারে একটি টেকসই, শক্তিশালী ও ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি।শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি সেই দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত?
সম্পাদক ও প্রকাশক এসএম পারভেজ
ফ: +8801716159137
Email: [email protected]